জুলকারনাইন স্বপনের 'নিস্তরঙ্গ' গল্প পাঠের অনুভূতি - হোসাইন মাইকেল

জুলকারনাইন স্বপনের 'নিস্তরঙ্গ' গল্প পাঠের অনুভূতি - হোসাইন মাইকেল

মাধ্যমিকে পড়া শরৎচন্দ্রের 'মহেশ' গল্পটি আপনার মনে আছে নিশ্চয়। অথবা শরৎচন্দ্র আর তার গল্পগুলো। তবে ধরে নেয়া যাক, মানুষের সুবিধা-অসুবিধা, অভাব, দারিদ্র আর সামাজিক ক্ষমতাচিত্র সম্পর্কে আপনার পড়াশোনা আছে। সুতরাং আজ একটি গল্পের পুনর্পাঠ করি। গল্পটি শরৎচন্দ্র'র নয়। শরৎচন্দ্র আপনার পরিচিত নাম, আর এখানে আপনাকে প্রস্তুত করবার উদাহরণ।


গল্পটি জুলকারনাইন স্বপন রচিত 'অতলে জীবন' গল্পগ্রন্থের 'নিস্তরঙ্গ'— যেটিকে দারিদ্রশীর্ষ কুড়িগ্রামের অভাব-অনটনের পাণ্ডুলিপি বলা যেতে পারে।


গল্পের মূল চরিত্র করিমুদ্দি ছেলে মেয়ে নিয়ে না খেয়ে থাকা দিন কামলা। ছেলেকে নিয়ে হাটে যায়। উদ্দেশ্য বেগুন বিক্রি করে চাউল কিনবে, নয়তো উপোস থাকতে হবে আজও। পথিমধ্যে দেখা হয় গ্রামের বৈষ্ণব কাকার সঙ্গে। কথোপকথনের এক পর্যায়ে করিমুদ্দি যাকে বলে,


খাওনের লাইগা বাড়ির সামনেই কয়ডা বেগুনের গাছ লাগাইছিলাম। কিন্তু ঘরে একমুঠো চাউলও নাই, বেগুন দিয়া কী করুম।


বৈষ্ণব কাকা মারফত করিমুদ্দি জানতে পারে, হাট বেগুন দিয়ে ভরে গেছে, তার বেগুন বিক্রি হবে কিনা সন্দেহ। বৈষ্ণব কাকা আরও জানান, পাশের বাড়ির মাজুদ্দি বেগুনের দাম শুনে হাটের মাঝে আধামণ বেগুন ফেলে রেখে গালে হাত দিয়ে বসে আছে।


তবু করিমুদ্দি হাটে যায়। এপাশ ওপাশ দেখে এক পাইকারের কাছে গেলে সে জানায় বেগুন কিনবে না। করিমুদ্দি আরেক পাইকারের কাছে যায়। করজোড়ে অনুরোধের পর তার কাছে এক টাকা কেজিতে বিক্রি করে সাত কেজি বেগুন। কিন্তু সাত টাকায় কিছুই হবে না ভেবে লুঙ্গির কোঁচায় টাকা রেখে হাটের বাইরে বেরোতে থাকে করিমুদ্দি। পেছনে তার ছেলে— হঠাৎ মোয়ার জন্যে বায়না ধরে। করিমুদ্দি রেগে গিয়ে বলে,


ও রে বড়লোকের পোলা রে, মোয়া খাইব। মরতে পারস না?


তারপরেই কিছুদূর এগোলে করিমুদ্দির ইচ্ছে হয় আট আনার বিড়ি কিনবে। কিন্তু ছেলেকে মোয়া কিনে দেয়নি বলে নিজেকে অপরাধী ভাবে, বিড়ি আর কেনা হয় না। করিমুদ্দি হাঁটতে থাকে। পেছনে তার ছেলে...


এই দ্যাশডাই এইরহম। আইজ একরহম তা কাইল আর একরহম। ফড়িয়াগো কারসাজিতে দাম উডানামা করে। সব লাভ অই ফড়িয়াই খায়। হ্যাগো পেট ভরে। আর যারা ঘাম ঝরাইয়া ফসল ফলায় হ্যারা আঙুল চোষে।


—হাঁটতে হাঁটতে বেগুনের দাম সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে ছেলেকে এমন কথা বলে করিমুদ্দি। এরপর বাপ ছেলের কথপোকথনে উঠে আসে করিমুদ্দির পুরোনো জীবন। সুখ, শান্তি, আর সম্পদের গল্প।


গল্পের একেবারে শেষের দিকে করিমুদ্দি কাঁদে, পুনরায় আফসোস করে ছেলেকে বলে,


"আবার কি তিনবেলা প্যাট পুইরা ভাত খাইতে পারুম? তরে মোয়া কিইন্যা দিতে পারুম?"


ছেলের উত্তরে পাঠক, হয়তো আপনিও কাঁদবেন করিমুদ্দির মতো। কিংবা ঈষৎ আনন্দে কিছুক্ষণ অথবা কিছুদিন অথবা আয়ুর সমান কাটতে পারে একটা চুপচাপ জীবন...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মন্তব্য করার আগে আর একবার চিন্তা করুন, যা বলতে চান তা যথার্থ কি?